আদালত অবমাননার অভিযোগ: আইনি মারপ্যাঁচে খুলনার আঞ্চলিক খাদ্য নিয়ন্ত্রক মামুনুর রশীদ
মোঃ জাহাঙ্গীর হোসেন খুলনা প্রতিনিধি:
খুলনা বিভাগের আঞ্চলিক খাদ্য নিয়ন্ত্রক (আরসি ফুড) মোঃ মামুনুর রশীদের বিরুদ্ধে উচ্চ আদালতের সুস্পষ্ট আদেশ অমান্য করার গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। আদালতের অন্তর্বর্তীকালীন নিষেজ্ঞা থাকা সত্ত্বেও ডিলার নিয়োগ ও বরাদ্দ সংক্রান্ত কার্যক্রম চালিয়ে যাওয়ায় খাদ্য বিভাগের ভেতরে-বাইরে তীব্র ক্ষোভ ও অসন্তোষ সৃষ্টি হয়েছে। সংক্ষুব্ধ ডিলাররা এখন তার বিরুদ্ধে হাইকোর্টে আদালত অবমাননার (Contempt of Court) মামলার প্রস্তুতি নিচ্ছেন।
মামলার প্রেক্ষাপট ও উচ্চ আদালতের নির্দেশনা
অনুসন্ধানে জানা যায়, খুলনা মহানগরীর ওএমএস ডিলার হুমায়ুন আলীসহ যশোর পৌরসভার বেশ কয়েকজন ডিলার খাদ্য বিভাগের বরাদ্দ বিতরণে স্বেচ্ছাচারিতা ও নিয়োগ প্রক্রিয়ায় অনিয়মের অভিযোগ তুলে গত ৪ সেপ্টেম্বর হাইকোর্টে একটি রিট পিটিশন দায়ের করেন। ওই রিটের প্রাথমিক শুনানি শেষে আদালত একটি অন্তর্বর্তীকালীন আদেশ জারি করেন। আদেশে বলা হয়, নির্দিষ্ট কিছু প্রশাসনিক বিষয়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণের আগে খাদ্য বিভাগকে অবশ্যই আদালতের অনুমতি নিতে হবে এবং স্থিতাবস্থা বজায় রাখতে হবে।
অভিযোগের কেন্দ্রবিন্দু: সিলেট থেকে নিয়ন্ত্রিত কার্যক্রম?
অভিযোগ উঠেছে, আদালতের আদেশের কপি হাতে পাওয়ার পরও আঞ্চলিক খাদ্য নিয়ন্ত্রক মোঃ মামুনুর রশীদ তা আমলে নেননি। সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, আদেশের সময় তিনি ব্যক্তিগত বা দাপ্তরিক কাজে সিলেটে অবস্থান করলেও, সেখান থেকেই টেলিফোনিক বা দাপ্তরিক নির্দেশের মাধ্যমে খুলনার কার্যক্রম চালু রাখেন। রিটকারীদের দাবি, আদালতের নিষেধাজ্ঞা সত্ত্বেও লাইসেন্স নবায়ন এবং বরাদ্দ বিতরণের মতো গুরুত্বপূর্ণ দাপ্তরিক কাজগুলো সম্পন্ন করা হয়েছে, যা সরাসরি আদালত অবমাননার শামিল।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে একজন ওএমএস ডিলার বলেন:
“হাইকোর্ট যখন স্পষ্ট নির্দেশনা দিয়েছেন যে কোনো নতুন সিদ্ধান্তের আগে আদালতের মতামত নিতে হবে, তখন তড়িঘড়ি করে আমাদের লাইসেন্স নবায়নের নোটিশ পাঠানো হয়েছে। এটি আইনকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখানোর সমান। আমরা আইনের আশ্রয় নিয়েছি বলেই এখন আমাদের ওপর চাপ সৃষ্টি করা হচ্ছে।”
প্রশাসনিক বিশৃঙ্খলা ও কর্মকর্তাদের নীরবতা
খুলনা বিভাগের ১০টি জেলার (খুলনা, বাগেরহাট, সাতক্ষীরা, যশোর, ঝিনাইদহ, মাগুরা, নড়াইল, কুষ্টিয়া, চুয়াডাঙ্গা ও মেহেরপুর) খাদ্য নিরাপত্তা তদারকির দায়িত্ব মোঃ মামুনুর রশীদের ওপর। ওএমএস এবং ভিজিএফ-এর মতো স্পর্শকাতর কর্মসূচিগুলো তার মাধ্যমেই নিয়ন্ত্রিত হয়। এমন একটি গুরুত্বপূর্ণ পদে থেকে আদালতের আদেশ অবজ্ঞা করায় সাধারণ ডিলারদের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়েছে।
খাদ্য বিভাগের একটি সূত্র দাবি করেছে, প্রশাসনিক কিছু জটিলতার কারণে আদেশের বাস্তবায়ন করতে বিলম্ব হয়েছে, এটি ইচ্ছাকৃত নয়। তবে আইনজ্ঞরা বলছেন, উচ্চ আদালতের আদেশ পাওয়ার পর তা কার্যকর না করা বা তার বিপরীতে কোনো পদক্ষেপ নেওয়া ‘ইচ্ছাকৃত অবমাননা’ হিসেবেই গণ্য হয়।
শাস্তির মুখে পড়তে পারেন কর্মকর্তারা
রিটকারীদের আইনজীবীরা জানিয়েছেন, তারা ইতিমধ্যে আদালত অবমাননার অভিযোগ দাখিলের নথিপত্র গুছিয়ে ফেলেছেন। আইন অনুযায়ী, আদালত অবমাননার প্রমাণ মিললে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তার জরিমানা থেকে শুরু করে কারাদণ্ড এবং বিভাগীয় শাস্তিমূলক ব্যবস্থা (যেমন: বরখাস্ত বা পদাবনতি) হতে পারে।
নিরুত্তর আঞ্চলিক খাদ্য নিয়ন্ত্রক
এসব অভিযোগের বিষয়ে বক্তব্য জানতে আঞ্চলিক খাদ্য নিয়ন্ত্রক মোঃ মামুনুর রশীদের সাথে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলে তিনি কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি। তবে তার কার্যালয়ের ওয়েবসাইট বলছে, তিনিই বর্তমানে দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা হিসেবে পুরো বিভাগের খাদ্য ব্যবস্থাপনা নিয়ন্ত্রণ করছেন।
জনমনে প্রশ্ন ও ভবিষ্যৎ পদক্ষেপ
খুলনার খাদ্য বিভাগে ওএমএস চাল বিতরণে অনিয়ম এবং ডিলার হয়রানির অভিযোগ দীর্ঘদিনের। এর মধ্যে খোদ আঞ্চলিক নিয়ন্ত্রকের বিরুদ্ধে আদালতের আদেশ অবমাননার অভিযোগ আসায় বিভাগের ভাবমূর্তি বড় ধরনের সংকটে পড়েছে। স্থানীয় সচেতন মহল এবং ডিলাররা এখন খাদ্য মন্ত্রণালয় ও খাদ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালকের জরুরি হস্তক্ষেপ কামনা করছেন।
রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তার এমন আচরণ বিচার বিভাগের প্রতি অবজ্ঞা কি না, এখন সেটিই দেখার বিষয়।
© All rights reserved © 2022
Leave a Reply