কিশোরগঞ্জে যথাযোগ্য মর্যাদায় ‘জুলাই শহিদ দিবস’ উদযাপিত: শহিদ পরিবারের পাশে দাঁড়ানো ও সুশাসন প্রতিষ্ঠার আহ্বান
নিজস্ব প্রতিবেদক, কিশোরগঞ্জ:
কিশোরগঞ্জে যথাযোগ্য মর্যাদা ও ভাবগম্ভীর পরিবেশে ‘জুলাই শহিদ দিবস ২০২৬’ পালিত হয়েছে। এ উপলক্ষে জেলা প্রশাসনের উদ্যোগে জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের সম্মেলন কক্ষে এক বিশেষ আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হয়।
দিবসের শুরুতে শহিদদের স্মরণে কিশোরগঞ্জ গুরুদয়াল সরকারি কলেজ মাঠে স্থাপিত জুলাই শহিদ স্মৃতিসৌধে পুষ্পস্তবক অর্পণ করে গভীর শ্রদ্ধা নিবেদন করা হয়।
১ মিনিটের নীরবতা ও স্মৃতিচারণ
জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের সম্মেলন কক্ষে আয়োজিত আলোচনা সভার শুরুতে জুলাই গণ-আন্দোলনে শাহাদাতবরণকারী সকল শহিদের আত্মার মাগফিরাত কামনায় দাঁড়িয়ে এক মিনিট নীরবতা পালন করা হয়। অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক) মো: ইশতিয়াক ইমনের পরিচালনায় সভায় বক্তারা জুলাই আন্দোলনের চেতনা সমুন্নত রেখে সমাজে ন্যায়বিচার, সুশাসন, শান্তি ও মানবিক মূল্যবোধ প্রতিষ্ঠার ওপর জোর দেন। একই সঙ্গে আহতদের দ্রুত চিকিৎসা এবং শহিদ পরিবারের পাশে দাঁড়ানোর আহ্বান জানানো হয়।
শহিদ পরিবারের আবেগঘন বক্তব্য ও দাবি
অনুষ্ঠানে উপস্থিত জুলাই শহিদদের পরিবারের সদস্যরা তাঁদের অনুভূতি ও দাবি তুলে ধরেন:
শহিদ সিফাত উল্লাহর পিতা: তিনি সকল শহিদ পরিবারের জন্য দোয়া চেয়ে সমাজের সর্বস্তরে শান্তি প্রতিষ্ঠা এবং একটি দুর্নীতিমুক্ত বাংলাদেশ গড়ার প্রত্যাশা ব্যক্ত করেন।
শহিদ তরিকুল ইসলাম রুবেলের ভাই: শহিদদের আত্মত্যাগের মূল্যায়ন করতে সমাজের সকল শ্রেণি-পেশার মানুষকে শহিদ পরিবারের পাশে দাঁড়ানোর আহ্বান জানান।
শহিদ মোবারক হোসেনের ছোট ভাই: আন্দোলনের স্মৃতিচারণ করে তিনি শহিদ পরিবারগুলোর প্রতি সব ধরনের হয়রানি বন্ধ এবং তাঁদের সম্মান ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দাবি জানান।
শহিদ মেহেদীর মা: অশ্রুসজল চোখে তিনি বলেন, গুলিবিদ্ধ ছেলেকে বাঁচাতে হাসপাতালে হাসপাতালে ঘুরেও শেষ রক্ষা হয়নি। তিনি তাঁর সন্তানের নির্মম হত্যাকাণ্ডের সুষ্ঠু বিচার দাবি করেন।
শহিদ সোহেলের নিকটাত্মীয়: সোহেলের জানাজায় তৎকালীন সময়ে সৃষ্ট প্রতিবন্ধকতার কথা উল্লেখ করে তিনি জুলাই শহিদ পরিবারের যথাযথ মর্যাদা, সম্মান ও রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি নিশ্চিত করার জোর দাবি জানান।
রাজনৈতিক, সামাজিক ও গণমাধ্যম ব্যক্তিত্বদের সংহতি
শহিদ ও আহতদের কল্যাণে প্রশাসন ও সমাজকে এগিয়ে আসার আহ্বান জানিয়ে বক্তব্য রাখেন স্থানীয় প্রতিনিধিরা:
সাইফুল মালেক চৌধুরী (সাধারণ সম্পাদক, কিশোরগঞ্জ প্রেসক্লাব): আন্দোলনের সময় তাঁর প্রতিষ্ঠানের ক্যামেরা পারসন গুলিবিদ্ধ হওয়ার ঘটনা উল্লেখ করে তিনি যেকোনো দুর্যোগে শহিদ ও আহত পরিবারের পাশে থাকার প্রতিশ্রুতি দেন।
অভি চৌধুরী (সাধারণ সম্পাদক, কিশোরগঞ্জ গণঅধিকার পরিষদ): শহিদ ও আহত পরিবারের কল্যাণে বর্তমান সরকারের চলমান সহযোগিতা অব্যাহত রাখার অনুরোধ জানান।
ইকরাম হোসেন (সাংগঠনিক সম্পাদক, জাতীয় নাগরিক পার্টি – এনসিপি): সুশাসন প্রতিষ্ঠাকে সময়ের দাবি উল্লেখ করে বলেন, সরকারি সেবা প্রতিটি নাগরিকের অধিকার।
দেলোয়ার হোসেন দিলু (সিনিয়র সহসভাপতি, কিশোরগঞ্জ চেম্বার অব কমার্স): জাতীয় স্বার্থে ঐক্যবদ্ধ ও দায়িত্বশীল রাজনীতির প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরেন।
হাজী ইসরাফিল মিয়া (সাংগঠনিক সম্পাদক, জেলা বিএনপি): তিনি শহিদ সোহেলের স্মৃতি রক্ষার্থে কিশোরগঞ্জের একটি সড়কের নাম তাঁর নামে করার প্রস্তাব করেন এবং সরকারের সহযোগিতা অব্যাহত থাকবে বলে আশা প্রকাশ করেন।
প্রশাসন, পুলিশ ও স্বাস্থ্য বিভাগের প্রতিশ্রুতি
অনুষ্ঠানে প্রশাসনের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা শহিদ পরিবারের সার্বিক কল্যাণে পাশে থাকার দৃঢ় অঙ্গীকার ব্যক্ত করেন।
”বাংলাদেশ পুলিশ শহিদ ও আহত পরিবারের বেদনা গভীরভাবে অনুভব করে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষার পাশাপাশি তাদের নিরাপত্তা, মর্যাদা এবং ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে পুলিশ সর্বদা দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করবে।”
— জনাব নাজমুস সাকিব খান, পিপিএম (অতিরিক্ত পুলিশ সুপার, প্রশাসন ও অর্থ)
ভারপ্রাপ্ত সিভিল সার্জন ডা. মোঃ নাজমুল করিম আন্দোলনে অংশ নেওয়া ও ক্ষতিগ্রস্তদের স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করতে স্বাস্থ্য বিভাগের আন্তরিকতা ও ভবিষ্যতেও প্রয়োজনীয় সহযোগিতা অব্যাহত রাখার আশ্বাস দেন।
জেলা প্রশাসকের সমাপনী বক্তব্য
সভার সমাপনী বক্তব্যে কিশোরগঞ্জের জেলা প্রশাসক জনাব সোহানা নাসরিন জুলাই গণ-আন্দোলনের শহিদদের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা নিবেদন করে বলেন:
”শহিদদের আত্মত্যাগ জাতির ইতিহাসে চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবে। শহিদ পরিবার ও আহতদের পাশে থেকে প্রয়োজনীয় সকল সরকারি সহযোগিতা নিশ্চিত করতে জেলা প্রশাসন প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।”
© All rights reserved © 2022
Leave a Reply