কুলিয়ারচর থানার ওসি প্রত্যাহার, হাতকড়াসহ পালিয়ে যাওয়া আ.লীগ নেতাসহ ৪ নারীর বিরুদ্ধে মামলা, প্রতিবাদে এলাকাবাসীর সংবাদ সম্মেলন
মুহাম্মদ কাইসার হামিদ, কুলিয়ারচর (কিশোরগঞ্জ):
কিশোরগঞ্জের কুলিয়ারচরে পুলিশ হেফাজত থেকে হাতকড়াসহ কৌশলে পালিয়ে যাওয়া আওয়ামী লীগ নেতা মো. রেনু মিয়াকে ১০ ঘন্টা পর হাতকড়া পড়া অবস্থায় গ্রেফতারের পরদিন ৪ নারীসহ রেনু মিয়ার বিরুদ্ধে থানায় একটি মামলা দায়ের করেছে পুলিশ। তবে রেনু মিয়ার স্বজন ও এলাকাবাসীর দাবী, স্থানীয় কয়েকজন রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে চাঁদাবাজির প্রতিবাদ করায় রেনু মিয়াসহ ৪ নারীকে ষড়যন্ত্রমূলক ভাবে গ্রেফতার করে থানায় নিয়ে মিথ্যা মামলায় ফাঁসানো হয়েছে।
অপর দিকে আওয়ামী লীগ নেতা মো. রেনু মিয়া পুলিশ হেফাজত থেকে হাতকড়াসহ পালিয়ে যাওয়ায়, দ্বায়িত্ব পালনে অবহেলার দায়ে কুলিয়ারচর থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) কাজী আরিফ উদ্দীন-কে শোকজ করার পাশাপাশি প্রশাসনিক কারন দেখিয়ে প্রত্যাহার করে কিশোরগঞ্জ পুলিশ লাইনে সংযুক্ত করা হয়েছে। গত ১৪ সেপ্টেম্বর সোমবার রাতে তাঁকে কুলিয়ারচর থানা থেকে প্রত্যাহার করা হয়।
জানা গেছে, গত ১৪ সেপ্টেম্বর সোমবার দুপুরে কুলিয়ারচর থানার ৯ (১১) ২৫ নম্বর মামলায় ছয়সূতী ইউনিয়নের ৯ নম্বর ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের সভাপতি মো. রেনু মিয়াকে আটক করতে উপজেলার মাধবদী গ্রামে রেনু মিয়ার বাড়িতে অভিযান চালায় পুলিশ। স্থানীয়দের ভাষ্য মতে, রেনু মিয়াকে আটক করে হাতকড়া পরানো হলে ঘটনাস্থলে লোকজন জড়ো হয়। এ সময় কৌশলে পুলিশ হেফাজত থেকে হাতকড়াসহ পালিয়ে যায় রেনু মিয়া। তিনি ছয়সূতী ইউনিয়নের মাধবদী এলাকার মৃত ইল্লাল মিয়ার ছেলে।
এ ঘটনায় এলাকায় চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হলে এর কিছুক্ষণ পর দেড় বছরের কন্যা শিশু আয়াত ও ৯ মাসের ছেলে শিশু রায়ানসহ রেনু মিয়ার ছেলে মনিরের স্ত্রী ইতি আক্তার (২৩), মেয়ে বিপাশা আক্তার (২৪), প্রতিবেশী বোন সাদিয়া আক্তার (২০), প্রতিবেশী রত্না (৩০), মরিয়ম (৪৫), আকলিমা (২৬) ও আরিফা আক্তার (৪০) নামে ৭ নারীকে ধরে থানায় নিয়ে যায় পুলিশ। পরে তাদের বিরুদ্ধে মামলা করার ভয় দেখিয়ে কৌশল অবলম্বনের মাধ্যমে পলাতক আওয়ামী লীগ নেতা মো. রেনু মিয়াকে সোমবার রাত সাড়ে ৯টার দিকে থানায় এনে তাঁকে গ্রেফতার করে।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে গ্রামের কয়েকজন বাসিন্দা বলেন, রেনু মিয়াকে পুলিশের কাছে ফিরিয়ে দিতে গ্রামবাসীর কাছে সহযোগিতা চায় পুলিশ। গ্রামের কিছু মানুষ সহযোগিতা করেন। তাঁদের ভাষ্য, রেনু মিয়ার কাছে মুঠোফোন না থাকায় পরিবারের সদস্যদের থানায় নেওয়ার খবর তিনি জানতেন না। পরে বিভিন্ন মাধ্যমে তাঁর কাছে খবর পৌঁছায়। ধরা না দিলে পরিবারের সদস্যদের আসামি করা হতে পারে, এমন আশঙ্কা থেকে শেষ পর্যন্ত তিনি পুলিশের কাছে ধরা দিয়েছেন।
রেনু মিয়াকে গ্রেফতারের প্রথম অভিযানের নেতৃত্ব দেন কুলিয়ারচর থানার উপপরিদর্শক (এসআই) মো. শারফিন মিয়া। দ্বিতীয় দফায় অভিযানেও তিনি ছিলেন। শারফিন মিয়া বলেন, ‘রেনু মিয়াকে গ্রেফতারে আমরা মরিয়া ছিলাম। একাধিক কৌশল নেওয়া হয়। শেষ পর্যন্ত ১০ ঘণ্টার মধ্যে তাঁকে আবার হাতে পাই।’
পুলিশ হেফাজতে রেনু মিয়া সাংবাদিকদের বলেন, হঠাৎ পুলিশ দেখে তিনি ভয় পেয়েছিলেন। গ্রামবাসী তাঁর পক্ষে কথা বলায় তিনি পালানোর সুযোগ পান। কিন্তু হাতকড়া নিয়ে তিনি গ্রাম ছাড়তে পারেননি। একটি বাড়িতে আশ্রয় নিয়েছিলেন। পরে বাড়ির সাত নারী সদস্যসহ শিশুদের কথা ভেবে তিনি পুলিশের কাছে ধরা দেন।
পুলিশ জানায়, সোমবার দুপুরে রেনু মিয়াকে গ্রেফতারের পর তাঁর দুই হাতে হাতকড়া পরানো হয়। এ সময় তাঁর পরিবারের সদস্য ও স্থানীয় লোকজন সেখানে জড়ো হন। একপর্যায়ে তাঁরা পুলিশকে ঘেরাও করে ধস্তাধস্তির মাধ্যমে রেনু মিয়াকে হাতকড়াসহ ছিনিয়ে নেয়। এ সময় পুলিশের কয়েকজন সদস্য আহত হন।
পরে রেনু মিয়াকে পুনরায় গ্রেফতারের অভিযান শুরু করে পুলিশ। একাধিক দল নিয়ে অভিযান চালিয়ে সোমবার রাত আনুমানিক ৯টা ৫০ মিনিটে, অর্থাৎ পালানোর প্রায় ১০ ঘণ্টার মধ্যে, মাধবদী এলাকা থেকে তাঁকে হাতকড়াসহ পুনরায় গ্রেফতার করা হয়।
রেনু মিয়াকে হাতকড়াসহ ছিনিয়ে নেওয়া, পুলিশের কাজে বাধা এবং পুলিশ সদস্যদের ওপর হামলার অভিযোগে কুলিয়ারচর থানার উপপরিদর্শক (এসআই) শারফিন মিয়া বাদী হয়ে গত ১৫ সেপ্টেম্বর প্রথম আওয়ারে রেনু মিয়া-কে প্রধান আসামী করে ১৫ জনের নাম উল্লেখ করে আরো অজ্ঞাতনামা ২০-২৫ জনের নামে দণ্ডবিধির ১৮৬, ৩৩২, ২২৪, ২২৫, ৩৫৩ ও ৩৪ ধারায় থানায় একটি মামলা দায়ের করে। মামলা নম্বর-১০।
দায়েরকৃত মামলার এজাহারে বলা হয়েছে, ঘটনার সময় পুলিশের সঙ্গে ধস্তাধস্তিতে এসআই শরাফিন মিয়া, কনস্টেবল বাবলু মিয়া ও কনস্টেবল সোহেল রানা আহত হন। পরে তাঁরা কুলিয়ারচর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে চিকিৎসা নেন।
এ মামলায় আওয়ামী লীগ নেতা মো. রেনু মিয়ার ছেলে মনিরের স্ত্রী ইতি আক্তার (২৩), প্রতিবেশী বোন সাদিয়া আক্তার (২০), প্রতিবেশী রত্না (৩০) ও আকলিমা (২৬) কে গ্রেফতার দেখিয়ে দেড় বছরের কন্যা শিশু আয়াত ও ৯ মাসের ছেলে শিশু রায়ানসহ তাঁদেরকে গত ১৫ সেপ্টেম্বর মঙ্গলবার বিকাল তিনটার দিকে কিশোরগঞ্জ জেলা বিজ্ঞ আদালতে প্রেরণ করে পুলিশ। নারীদের মধ্যে একজন অন্তঃসত্ত্বা ছিলেন। দেড় বছরের শিশু আয়াত ইতি আক্তারের কন্যা ও ৯ মাসের শিশু রায়ান সাদিয়া আক্তারের ছেলে।
এছাড়া রেনু মিয়ার মেয়ে বিপাশা আক্তার (২৪), প্রতিবেশী মরিয়ম (৪৫) ও আরিফা আক্তার (৪০) অসুস্থ থাকায় তাঁদের নিকট থেকে মুছলেখা নিয়ে তাঁদের পরিবারের সদস্যদের নিকট বুঝিয়ে দেয় পুলিশ।
কুলিয়ারচর থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) কাজী আরিফ উদ্দীন এ ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করে বলেন, সরকারি আদেশে তাঁকে বদলী করা হয়েছে। মঙ্গলবার দুপুর ১২টার দিকে থানার ওসি (তদন্ত) মো. মোবারক হোসেনের নিকট দায়িত্ব বুঝিয়ে দেন তিনি।
এব্যাপারে কুলিয়ারচর থানার ওসি (তদন্ত) মো. মোবারক হোসেনের সাথে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, মঙ্গলবার দুপুরে ওসি কাজী আরিফ উদ্দীনের নিকট থেকে দ্বায়িত্ব বুঝে নিয়েছেন তিনি।
আওয়ামী লীগ নেতা মো. রেনু মিয়াসহ ৪ নারীর বিরুদ্ধে মামলা দায়ের ও তাঁদের জেল হাজতে প্রেরণের ঘটনায় গত ১৭ সেপ্টেম্বর বৃহস্পতিবার দুপুরে মাধবদী গ্রামে সংবাদ সম্মেলন করে রেনু মিয়ার পরিবার ও এলাকাবাসী ঘটনার পেছনের কারণ তুলে ধরেন। তাঁদের দাবি, মেয়ে সংক্রান্ত বিষয় নিয়ে স্থানীয় একটি হিন্দু পরিবারের কাছে স্থানীয় কিছু রাজনৈতিক ব্যক্তি চাঁদা দাবি করে। চাঁদা দাবির প্রতিবাদ করায় রেনু মিয়ার ওপর ক্ষোভ সৃষ্টি হয় প্রতিপক্ষের কতিপয় কয়েকজন প্রভাবশালী রাজনৈতিক ব্যক্তির। মেয়ে সংক্রান্ত ঘটনায় মাধবদী কর্মকারপাড়ার সজিব রায় (৩৫) নামে এক সিঙ্গাপুরপ্রবাসীর পরিবারের নিকট চাঁদা দাবি ও ব্ল্যাকমেইলের ঘটনা সমাধান করতে গিয়ে আওয়ামী লীগ নেতা রেনু মিয়া প্রতিপক্ষের তোপের মুখে পড়েন। রেনু মিয়া বিষয়টি ঊর্ধ্বতন মহলকে অবহিত করায় চটে গিয়ে তাঁকে হয়রানি করতে প্রতিপক্ষ গত সোমবার দুপুরে পুলিশ লেলিয়ে দিয়ে তাঁকে একটি মিথ্যা মামলায় আটক করালে সে কৌশলে পুলিশকে ফাঁকি দিয়ে হাতকড়াসহ পালিয়ে যায়। পরে তিনি থানায় গিয়ে পুলিশের হাতে ধরা দেন।
রেনু মিয়ার পরিবারের সদস্যরা দাবি করেন, তিনি কোনো অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে জড়িত ছিলেন না; কেবল বিপদে পড়া একটি অসহায় পরিবারকে সহযোগিতা করতেই ঘটনাস্থলে গিয়েছিলেন। চাঁদাবাজির প্রতিবাদ করায় তাঁকে পরিকল্পিতভাবে ষড়যন্ত্রমূলক মামলায় আসামি করা হয়েছে এবং তাঁর পরিবারের সদস্যদের নানাভাবে হয়রানি করা হচ্ছে। এলাকাবাসী রেনু মিয়া ও নিরীহ নারীদের ওপর থেকে এ মিথ্যা মামলা প্রত্যাহার এবং ঘটনার নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি জানিয়েছেন।
© All rights reserved © 2022
Leave a Reply