বাংলাদেশের রাজনৈতিক, আইন ও সাংবিধানিক ইতিহাসে খান আসাদুজ্জামান এক উজ্জ্বল ও সম্মানিত নাম। তিনি ছিলেন একজন বিশিষ্ট আইনজীবী, রাজনীতিবিদ, সংসদ সদস্য, মুক্তিযুদ্ধের সংগঠক এবং স্বাধীন বাংলাদেশের সংবিধান প্রণয়ন কমিটির অন্যতম সদস্য। গণতন্ত্র, ন্যায়বিচার ও জনগণের অধিকার প্রতিষ্ঠার সংগ্রামে তিনি আজীবন অবিচল ছিলেন।
খান আসাদুজ্জামান ১৯১৬ সালে তৎকালীন ময়মনসিংহ জেলার কিশোরগঞ্জ মহকুমার হোসেনপুরে এক সম্ভ্রান্ত পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। শৈশব থেকেই তিনি ছিলেন মেধাবী ও অধ্যবসায়ী। উচ্চশিক্ষার জন্য তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়ন করেন এবং সেখান থেকে ইতিহাস বিষয়ে এম.এ. ও আইন বিষয়ে বি.এল. ডিগ্রি অর্জন করেন।
শিক্ষাজীবন শেষে ১৯৪১ সালে তিনি বেঙ্গল সিভিল সার্ভিসে যোগদান করেন। প্রশাসনিক দক্ষতা ও সততার স্বাক্ষর রেখে তিনি কর্মজীবন শুরু করেন। ১৯৪৫ সাল থেকে জুডিসিয়াল সার্ভিসে মুন্সেফ হিসেবে প্রায় ছয় বছর দায়িত্ব পালন করেন। তবে ন্যায়বিচার ও জনসেবার বৃহত্তর ক্ষেত্রকে বেছে নেওয়ার লক্ষ্যে তিনি সরকারি চাকরি থেকে স্বেচ্ছায় পদত্যাগ করেন।
১৯৫২ সালে তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগে খণ্ডকালীন শিক্ষক হিসেবে যোগদান করেন। একই সময়ে তিনি ঢাকা হাইকোর্টে আইন পেশা শুরু করেন এবং অল্প সময়ের মধ্যেই একজন দক্ষ ও সুনামধন্য আইনজীবী হিসেবে পরিচিতি লাভ করেন। তাঁর যুক্তিবাদী চিন্তা, প্রখর মেধা ও ন্যায়ের প্রতি অঙ্গীকার তাঁকে আইনাঙ্গনে বিশেষ মর্যাদা এনে দেয়।
রাজনৈতিক জীবনেও তিনি ছিলেন অত্যন্ত সক্রিয়। মৌলিক গণতন্ত্র ব্যবস্থার সময় স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে নির্বাচনে অংশগ্রহণ করে ১৯৬৫ সালে পূর্ব পাকিস্তান প্রাদেশিক পরিষদের সদস্য নির্বাচিত হন। জনগণের স্বার্থে তাঁর দৃঢ় অবস্থান ও বলিষ্ঠ নেতৃত্বের কারণে ১৯৬৭ সালে তিনি পরিষদের বিরোধী দলীয় নেতা নির্বাচিত হন। সে সময় পূর্ব বাংলার জনগণের ন্যায্য অধিকার প্রতিষ্ঠার প্রশ্নে তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন।
১৯৭০ সালের ঐতিহাসিক সাধারণ নির্বাচনে তিনি ময়মনসিংহ থেকে জাতীয় পরিষদের সদস্য নির্বাচিত হন। পাকিস্তানি শাসনবিরোধী গণআন্দোলন এবং পরবর্তীকালে মহান মুক্তিযুদ্ধে তিনি সক্রিয় ভূমিকা পালন করেন। স্বাধীন বাংলাদেশের অভ্যুদয়ের পর রাষ্ট্রগঠনের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বেও তিনি অংশ নেন। তিনি ছিলেন বাংলাদেশের সংবিধান প্রণয়ন কমিটির একজন সদস্য, যা জাতির ইতিহাসে তাঁর অবদানের অন্যতম শ্রেষ্ঠ নিদর্শন।
স্বাধীনতার পর ১৯৭৩ ও ১৯৭৯ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে তিনি পরপর সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। সংসদে তাঁর যুক্তিনির্ভর বক্তব্য, গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ এবং জনকল্যাণমূলক চিন্তাধারা বিশেষভাবে প্রশংসিত হয়।
১৯৭৫ সালে তিনি বাংলাদেশের মন্ত্রিসভায় পাটমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। পরবর্তীকালে বন্দর, জাহাজ চলাচল ও অভ্যন্তরীণ নৌ-পরিবহন মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রীর দায়িত্বও পালন করেন। দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়ন, নৌ-যোগাযোগ ব্যবস্থা এবং প্রশাসনিক কার্যক্রমে তাঁর অবদান স্মরণীয় হয়ে আছে।
রাজনৈতিক অঙ্গনে তিনি ছিলেন নীতিনিষ্ঠ ও আপসহীন একজন নেতা। ১৯৮২ সালের মার্চ মাস পর্যন্ত তিনি জাতীয় সংসদে বিরোধী দলীয় নেতার দায়িত্ব পালন করেন। গণতন্ত্র, আইনের শাসন ও সাংবিধানিক রাজনীতির প্রতি তাঁর অঙ্গীকার তাঁকে সমকালীন রাজনৈতিক নেতাদের মধ্যে স্বতন্ত্র মর্যাদা দিয়েছিল।
দীর্ঘ কর্মময় জীবনের অবসান ঘটে ১৯৯২ সালের ২১ জানুয়ারি। তিনি ঢাকায় মৃত্যুবরণ করেন। তাঁর মৃত্যুতে দেশ একজন প্রাজ্ঞ আইনজ্ঞ, গণতান্ত্রিক রাজনীতির নিবেদিতপ্রাণ কর্মী এবং স্বাধীন বাংলাদেশের অন্যতম রাষ্ট্রনির্মাতাকে হারায়।
খান আসাদুজ্জামান আজও স্মরণীয় তাঁর সততা, প্রজ্ঞা, দেশপ্রেম এবং জনগণের প্রতি অটল দায়বদ্ধতার জন্য। বাংলাদেশের রাজনৈতিক ও সাংবিধানিক ইতিহাসে তাঁর অবদান চিরকাল শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করা হবে।
© All rights reserved © 2022
Leave a Reply