কুলিয়ারচরে নিম্নমানের সামগ্রী দিয়ে রাস্তা নির্মাণ; এলাকাবাসীর প্রতিবাদের মুখে কাজ বন্ধ হওয়ার পর পুনরায় অনিয়মের অভিযোগে তীব্র অসন্তোষ
মুহাম্মদ কাইসার হামিদ, কুলিয়ারচর (কিশোরগঞ্জ)::
কিশোরগঞ্জের কুলিয়ারচর উপজেলার গোবরিয়া আব্দুল্লাহপুর ইউনিয়নে এলজিইডির একটি গুরুত্বপূর্ণ রাস্তা নির্মাণকাজে বারবার নিম্নমানের নির্মাণসামগ্রী ব্যবহারের অভিযোগ উঠছে। এর আগে এলাকাবাসীর তীব্র প্রতিবাদের মুখে কাজ বন্ধ করে দেওয়া হলেও, সম্প্রতি আবারও একই রাস্তায় নিম্নমানের বালু দিয়ে কাজ করার অভিযোগ উঠেছে। এ নিয়ে স্থানীয় এলাকাবাসীর মধ্যে তীব্র ক্ষোভ ও অসন্তোষ দেখা দিয়েছে।
উপজেলা এলজিইডি অফিস সূত্রে জানা গেছে, ২ কোটি ৭৪ লাখ টাকা ব্যয়ে উপজেলার গোবরিয়া-আব্দুল্লাহপুর ইউনিয়নের লক্ষ্মীপুর-পিরিজপুর পাকা সড়কের দক্ষিণ গোবরিয়া (জাব্বা বাড়ি) মোড় থেকে পূর্ব গোবরিয়া ইশাতুল উলুম ফাজিল ডিগ্রি মাদ্রাসা পর্যন্ত দেড় কিলোমিটার রাস্তা নির্মাণের কাজ পায় চট্টগ্রামের ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান মেসার্স ইউনূস অ্যান্ড ব্রাদার্স। বেশ কিছুদিন আগে প্রতিষ্ঠানটি এই সড়কের নির্মাণকাজ শুরু করে।
এর আগে গত ১৭ জুলাই ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানটি নিম্নমানের সামগ্রী দিয়ে রাস্তার কাজ শুরু করলে তা স্থানীয় যুবসমাজ ও এলাকাবাসীর নজরে আসে। কাজের প্রকাশ্য এই অনিয়মে ক্ষুব্ধ হয়ে এলাকাবাসী তাৎক্ষণিকভাবে কাজে বাধা দেন এবং নির্মাণকাজ বন্ধ করে দেন। এ সময় নিম্নমানের সামগ্রী দিয়ে কাজ করার কয়েকটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে তা দ্রুত ভাইরাল হয় এবং এলাকায় ব্যাপক চাঞ্চল্যের সৃষ্টি করে।
খবর পেয়ে উপজেলা এলজিইডি অফিসের তৎকালীন উপ-সহকারী প্রকৌশলী মামুন মিয়া ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে অনিয়মের সত্যতা পান এবং ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে সাময়িকভাবে কাজ বন্ধ রাখার নির্দেশ দেন। পাশাপাশি ব্যবহৃত নিম্নমানের সামগ্রী সরিয়ে ভালো উপাদান দিয়ে কাজ করার তাগিদ দেন। সে সময় এলজিইডি কর্মকর্তা মামুন মিয়া গণমাধ্যমকে জানিয়েছিলেন, “আমরা কাজের মানের ব্যাপারে কোনো আপস করব না।”
তবে কিছুদিন কাজ বন্ধ থাকার পর সম্প্রতি ফের ওই একই রাস্তায় নিম্নমানের সামগ্রী ব্যবহার করে কাজ শুরু করার অভিযোগ উঠেছে। এলাকাবাসীর অভিযোগ, রাস্তা নির্মাণে পাথরের সঙ্গে যে বালু ব্যবহার করা হচ্ছে, তা দেখতে সাধারণ ভিটাবালুর মতো। নির্মাণসামগ্রীর এমন নিম্নমানের কারণে রাস্তাটির স্থায়িত্ব নিয়ে গভীর শঙ্কা তৈরি হয়েছে। গ্রামীণ অবকাঠামোগত উন্নয়নে সরকারি অর্থের এমন অপচয় ও খামখেয়ালিপনা কোনোভাবেই মেনে নেওয়া যায় না বলে মন্তব্য করেছেন ক্ষুব্ধ এলাকাবাসী।
স্থানীয়দের অভিযোগ, চলমান অনিয়মের বিষয়টি সংশ্লিষ্ট দপ্তরের দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রকৌশলীকে অবগত করা হলেও এখন পর্যন্ত কোনো কার্যকর পদক্ষেপ বা প্রতিকার পাওয়া যায়নি।
এ বিষয়ে মো. লোকমান হোসাইন তার ব্যক্তিগত ফেসবুক আইডি থেকে নিম্ন মানের সামগ্রির একাধিক ভিডিও ও ছবিসহ একটি প্রতিবাদলিপি পোষ্ট করেছেন। সেখানে তিনি লিখেছেন, “সরকারি অর্থে রাস্তা নির্মাণ হলে সেই কাজের মান যাচাই করার দায়িত্ব কার? জনগণের টাকায় নির্মিত রাস্তা যদি নিম্নমানের সামগ্রী দিয়ে তৈরি হয়, তাহলে সেই রাস্তা কত দিন টিকবে? আমরা কারও বিরুদ্ধে ব্যক্তিগত আক্রোশ থেকে কথা বলছি না। আমরা চাই সঠিক তদন্ত, নির্মাণসামগ্রীর মান যাচাই এবং অনিয়ম প্রমাণিত হলে যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ।”
তিনি আরও উল্লেখ করেন, “জনগণের উন্নয়নের টাকা জনগণের উন্নয়নেই ব্যয় হোক। কোনো অনিয়ম হয়ে থাকলে তার জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে। আমরা প্রতিশ্রুতি নয়, মানসম্মত রাস্তা চাই। আমরা আশ্বাস নয়, কার্যকর পদক্ষেপ চাই।”
স্থানীয়দের অভিযোগ, চট্টগ্রামের ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান মেসার্স ইউনূস অ্যান্ড ব্রাদার্স কুলিয়ারচরের আরও বেশ কয়েকটি রাস্তার নির্মাণকাজের টেন্ডার পেয়েছিল এবং এর আগেও তাদের বিভিন্ন উন্নয়নমূলক কাজে অনিয়মের তথ্য পাওয়া গেছে।
উন্নয়নের নামে এ ধরনের অনিয়ম ও উদাসীনতা পাকাপোক্তভাবে বন্ধ করতে, দ্রুত ঘটনাস্থল সরেজমিনে পরিদর্শনপূর্বক নির্মাণসামগ্রীর মান পরীক্ষা করতে এবং কাজের শতভাগ গুণগত মান নিশ্চিত করতে সংশ্লিষ্ট ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের জরুরি ও কঠোর হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন এলাকার সচেতন মহল।
এ ব্যাপারে উপজেলা প্রকৌশলী (এলজিইডি) মো. আলী জিন্নাহ’র সাথে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, ওই রাস্তায় নিম্ন মানের বালু দিয়ে কাজ করার কথা শুনেছি। ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে নিম্ন মানের বালু সরিয়ে নিয়ে মানসম্মত বালু দিয়ে কাজ করার কথা বলা হয়েছে।
© All rights reserved © 2022
Leave a Reply