বাংলাদেশ পুলিশ-এ নতুন অধ্যায়: দায়িত্ব নিলেন মোঃ আলী হোসেন ফকির-প্রত্যাশা দৃশ্যমান আইনের শাসন
বিশেষ প্রতিবেদক–রবিউল আউয়াল
বাংলাদেশ পুলিশের নবনিযুক্ত ইন্সপেক্টর জেনারেল (আইজিপি) মোঃ আলী হোসেন ফকির বুধবার সকালে পুলিশ হেডকোয়ার্টার্সে আনুষ্ঠানিকভাবে দায়িত্বভার গ্রহণ করেছেন। দায়িত্ব গ্রহণের আগে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় মঙ্গলবার (২৪ ফেব্রুয়ারি) তাঁকে আইজিপি পদে নিয়োগ দিয়ে প্রজ্ঞাপন জারি করে। তিনি বিদায়ী আইজিপি বাহারুল আলম বিপিএম-এর স্থলাভিষিক্ত হলেন। পুলিশ হেডকোয়ার্টার্সে পৌঁছালে একটি সুসজ্জিত দল তাঁকে গার্ড অব অনার প্রদান করে। দায়িত্ব গ্রহণের মধ্য দিয়ে দেশের আইনশৃঙ্খলা ব্যবস্থাপনায় নতুন নেতৃত্বের আনুষ্ঠানিক সূচনা হলো। পেশাগত পথচলা ও অভিজ্ঞতা: ১৯৯৫ সালের ১৫ নভেম্বর ১৫তম বিসিএস (পুলিশ) ব্যাচে সহকারী পুলিশ সুপার (এএসপি) হিসেবে পুলিশে যোগ দেন মোঃ আলী হোসেন ফকির। প্রায় তিন দশকের কর্মজীবনে তিনি সততা,দক্ষতা ও পেশাদারত্বের সঙ্গে দেশের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ ইউনিটে দায়িত্ব পালন করেছেন। তিনি নেত্রকোনা,ফেনী ও মাগুরা জেলার পুলিশ সুপার ছিলেন। র্যাপিড রেসপন্স ফোর্স (আরআরএফ) সিলেটের কমান্ড্যান্ট এবং ৩ এপিবিএন খুলনা,৫ এপিবিএন ঢাকা ও ৭ এপিবিএন সিলেটের অধিনায়ক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। ডিআইজি হিসেবে পুলিশ হেডকোয়ার্টার্স ও এসপিবিএন-এ কর্মরত ছিলেন।
জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশনে কসোভো ও আইভরি কোস্টে দায়িত্ব পালন করে আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও তিনি অভিজ্ঞতা অর্জন করেন। সরকারি দায়িত্ব ও প্রশিক্ষণসূত্রে যুক্তরাষ্ট্র ও চীনসহ বিভিন্ন দেশ সফর করেছেন। শিক্ষাজীবনে তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ম্যানেজমেন্টে বিকম (অনার্স), এমকম ও এমবিএ ডিগ্রি অর্জন করেন।
১৯৬৮ সালের ৫ এপ্রিল বাগেরহাট জেলায় জন্ম নেওয়া এই কর্মকর্তা ব্যক্তিগত জীবনে বিবাহিত এবং এক পুত্র ও এক কন্যা সন্তানের জনক।
নতুন নেতৃত্বে নতুন প্রত্যাশা: নতুন আইজিপির দায়িত্ব গ্রহণের খবর প্রকাশের পর দেশের বিভিন্ন স্তরে আশাবাদের সুর শোনা যাচ্ছে। কারণ, সাম্প্রতিক সময়ে বিভিন্ন জেলায় চাঁদাবাজি, সশস্ত্র হামলা,লুটপাট,দখলবাজি ও মাদকসংক্রান্ত অপরাধ নিয়ে উদ্বেগ বেড়েছে। ব্যবসায়ী, ঠিকাদার,ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের দায়িত্বশীল ব্যক্তি থেকে শুরু করে সাংবাদিক—অনেকেই নিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন। কোথাও কোথাও একই চক্রের বিরুদ্ধে একাধিক অভিযোগ জমা পড়লেও দৃশ্যমান ও দ্রুত আইনি অগ্রগতির অভাব নিয়ে জনমনে সংশয় রয়েছে। এমন প্রেক্ষাপটে নতুন নেতৃত্বের কাছে মানুষের প্রত্যাশা কয়েকটি বিষয়ে স্পষ্ট—১.আইনের সমতা বিষয়ে কঠোর বার্তা,দল,পরিচয় বা প্রভাব নয়—অপরাধই হবে বিবেচ্য বিষয়। মাঠপর্যায়ে একটি স্পষ্ট ও দৃশ্যমান বার্তা গেলে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতিতে ইতিবাচক পরিবর্তন আসতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। ২.দৃশ্যমান ও সমন্বিত অভিযান,শুধু নির্দেশনা নয়; ঝুঁকিভিত্তিক নজরদারি,সমন্বিত অভিযান,দ্রুত তদন্ত ও সময়মতো চার্জশিট—এসব পদক্ষেপ বাস্তব ফল বয়ে আনবে—এমন প্রত্যাশা রয়েছে। অপরাধী যদি বুঝতে পারে যে ছাড় নেই,তখনই প্রতিরোধ কার্যকর হবে। ৩.ভুক্তভোগী ও সাক্ষী সুরক্ষা:
অভিযোগকারীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা গেলে মানুষ সাহস পাবে। অনেক ক্ষেত্রে প্রতিশোধের আশঙ্কায় অভিযোগ তুলতে অনীহা দেখা যায়। কার্যকর সুরক্ষা ব্যবস্থাই আস্থা ফিরিয়ে আনতে পারে। ৪.জবাবদিহিমূলক ও প্রযুক্তিনির্ভর পুলিশিং: থানায় অভিযোগ নিয়ে গিয়ে হয়রানি বা দীর্ঘসূত্রতা যেন না হয়—এটি এখন নাগরিকের মৌলিক দাবি। প্রযুক্তিনির্ভর অভিযোগ গ্রহণ, অনলাইন ট্র্যাকিং ও তদারকি জোরদার হলে স্বচ্ছতা বাড়বে এবং জনআস্থা দ্রুত ফিরে আসবে। বাস্তবতার মুখোমুখি প্রত্যাশা:
আইনশৃঙ্খলা রক্ষা কেবল প্রশাসনিক দায়িত্ব নয়; এটি রাষ্ট্র ও নাগরিকের পারস্পরিক আস্থার ভিত্তি। অভিযোগ মানেই অপরাধ প্রমাণ নয়—তবে স্বচ্ছ,সময়োপযোগী ও নিরপেক্ষ তদন্তই পারে সত্য উদ্ঘাটন করতে এবং আস্থা ফিরিয়ে আনতে। নতুন আইজিপির নেতৃত্বে যদি চাঁদাবাজি,সন্ত্রাস,মাদক ও দখলবাজির বিরুদ্ধে দৃশ্যমান,সমন্বিত ও নিরপেক্ষ উদ্যোগ জোরদার হয়,তবে শুধু একটি অঞ্চল নয়—সারা দেশের মানুষ স্বস্তি পাবে। বাংলাদেশের মানুষ এখন কাগুজে ঘোষণা নয়,বাস্তব পরিবর্তন দেখতে চায়। আইনের শাসন হোক সমান,কার্যকর ও দৃশ্যমান—এই প্রত্যাশাই আজ সবচেয়ে বড় আশাবাদ।
© All rights reserved © 2022
Leave a Reply