1. dailyjanatarshakti@dailyjanatarshakti.com : dailyjanatarshakti : dailyjanatarshakti
  2. zakirhosan68@gmail.com : zakirbd :
গাঙ্গাটিয়া জমিদার বাড়ি :ইতিহাস, ঐতিহ্য, স্থাপত্য ও গৌরবের এক অধ্যায়। - dailyjanatarshakti
মঙ্গলবার, ১৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৬:৪২ অপরাহ্ন

গাঙ্গাটিয়া জমিদার বাড়ি :ইতিহাস, ঐতিহ্য, স্থাপত্য ও গৌরবের এক অধ্যায়।

Reporter Name
  • Update Time : মঙ্গলবার, ১৫ সেপ্টেম্বর, ২০২৬
  • ২ Time View

গাঙ্গাটিয়া জমিদার বাড়ি :ইতিহাস, ঐতিহ্য, স্থাপত্য ও গৌরবের এক অধ্যায়।

সঞ্জিত চন্দ্র শীল
হোসেনপুর (কিশোরগঞ্জ) প্রতিদিন:
কিশোরগঞ্জ জেলার হোসেনপুর উপজেলার গোবিন্দপুর ইউনিয়নের গাঙ্গাটিয়া গ্রামে অবস্থিত গাঙ্গাটিয়া জমিদার বাড়ি প্রায় চারশো বছর ধরে ঐতিহ্যের গর্ব বহন করছে। স্থানীয়রা এটি ‘মানবাবুর বাড়ি’ নামে চেনেন। এই জমিদার বাড়ি রোমান-গ্রিক স্থাপত্যশৈলীর এক অনন্য নিদর্শন, যা তার দৃষ্টিনন্দন নকশা ও কারুকার্যের জন্য বিশেষভাবে পরিচিত।

ঐতিহ্যবাহী এই জমিদার বাড়ির শেষ বংশধর ৯৩ বছর বয়সী মানবেন্দ্র নাথ চক্রবর্তী চৌধুরী (মানব বাবু) আজো জীবিত আছেন। ঐতিহাসিক গাঙ্গাটিয়া জমিদার বাড়ি রোমান-গ্রিক স্থাপত্যের এক অনন্য নিদর্শন।

এটি কিশোরগঞ্জ জেলার হোসেনপুর উপজেলার গোবিন্দপুর ইউনিয়নের গাঙ্গাটিয়া গ্রামে অবস্থিত এবং জেলা সদর থেকে প্রায় ১২ কিলোমিটার দূরে। এই নান্দনিক নির্মিত ভবনটি প্রাচীন সভ্যতার নিদর্শনস্বরূপ। বাড়িটির স্থাপত্যশৈলীতে ১৮শ শতাব্দীর রোমান-গ্রিক স্থাপত্যের চমৎকার ব্যবহার লক্ষ করা যায়।

মানবেন্দ্র নাথ চক্রবর্তী চৌধুরী হলেন গাঙ্গাটিয়া জমিদার বংশের শেষ উত্তরাধিকারী। তিনি এখনও সেখানে বসবাস করছেন। তিনি কলকাতায় পড়াশোনা করেছেন এবং জেনারেল এরশাদের শাসনামলে ১৯৮৫ সালে হোসেনপুর উপজেলা চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন। জমিদার বাড়ির আশেপাশে তিনি মাছ চাষ করেন এবং জমিদার এস্টেটের বিস্তৃত এলাকায় চাষাবাদ পরিচালনা করেন।

জানা যায়, ১৬শ শতাব্দীতে ভারতের উত্তর প্রদেশ থেকে একজন উচ্চশিক্ষিত পণ্ডিত পূর্ববঙ্গে (বর্তমানে বাংলাদেশ) এসে বসতি স্থাপন করেন। তার মাতুলালয় ছিল ভারতের ত্রিপুরা রাজ্যের কমলপুর মহকুমার কমলপুর এলাকায়। ত্রিপুরা রাজ্যের কমলপুর মহকুমার কমলপুর শহরের শশীকান্ত ভট্টাচার্য ছিলেন গাঙ্গাটিয়া জমিদার পরিবারের ভূপতিনাথ চক্রবর্তী চৌধুরীর শ্বশুর।

তাঁদের পূর্বপুরুষেরা ছিলেন রাজবংশীয় ব্রাহ্মণ। তিনিই ছিলেন এই জমিদার পরিবারের প্রথম পুরুষ। সে সময় তিনি গৌড়ীয় পরম্পরা অনুযায়ী বাড়ির ধ্বংসপ্রাপ্ত ভবনে পূজার জন্য একটি শিব মন্দির নির্মাণ করেন। এটিই ছিল এই বংশের নির্মিত প্রথম শিব মন্দির।

এই জমিদার পরিবার এক সময় ধ্যান, পূজা এবং আচার-অনুষ্ঠানের মাধ্যমে এলাকায় ব্যাপক মর্যাদা ও খ্যাতি অর্জন করে। এই বংশের দীননাথ চক্রবর্তী ছিলেন এলাকার প্রথম জমিদার। ১৮শ শতকের শেষভাগে তিনি হোসেনশাহী পরগনার এক-তৃতীয়াংশ ক্রয় করে এলাকায় জমিদারি প্রতিষ্ঠা করেন।

পরবর্তীতে দীননাথ চক্রবর্তীর পুত্র অতুলচন্দ্র চক্রবর্তী আঠারবাড়ির জমিদার জ্ঞানদাসুন্দরী চৌধুরানী থেকে আরও দুই আনা জমি কিনে তা গঙ্গাটিয়া জমিদারির সঙ্গে যুক্ত করেন। এইভাবে গঙ্গাটিয়া জমিদার বাড়ি বিস্তৃত হয়। এই পরিবারের প্রথম শিব মন্দিরটি জমিদার বাড়ি থেকে প্রায় এক কিলোমিটার দূরে নির্মিত হয়েছিল। এটি বর্তমানে ধ্বংসপ্রাপ্ত হলেও এখনো সময়ের সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে আছে।

এই মন্দিরের পাশেই রয়েছে বিশাল পুকুর সাগরদিঘী। এরপরেই আরেকটি পুরনো ধ্বংসপ্রাপ্ত শিবমন্দির দেখা যায়, যেখানে এখনও পারিবারিক পূজা অনুষ্ঠিত হয়। পরবর্তীতে একটি বিশাল ফটকে শ্রীধর ভবন দেখা যায়। এখান থেকে প্রায় ৩০০ গজ দূরে গাঙ্গাটিয়া জমিদার বাড়ির মূল ভবন অবস্থিত। মূল ফটকের সামনে থেকে প্রায় ১২ ফুট চওড়া একটি সুন্দর রাস্তা। যার দু’পাশে নারকেল গাছের সারি । সেই পথে হেঁটে জমিদার বাড়িতে প্রবেশ করতে হয়। এই বাড়ির সৌন্দর্য যে কাউকে মুগ্ধ করে।

অবাক করার মতো বিষয় হলো এত বছর আগে এই বাড়ির স্থাপত্য শৈলী এত সুন্দরভাবে নির্মিত হয়েছিল। মূল ভবনটি দুই তলা বিশিষ্ট। এখানে বসার ঘর, অতিথি কক্ষ, আদালত কক্ষ ও সংগীতচর্চার কক্ষ রয়েছে। এছাড়া রয়েছে কাচারিঘর, নাহাবতখানা ও দরবারঘর। এই জমিদার বাড়ির স্তম্ভগুলোর উপর সুন্দর কারুকাজ চোখে পড়ে। বাড়ির সামনে রয়েছে একটি বড় উঠোন এবং চারপাশে উঁচু প্রাচীর দিয়ে ঘেরা।

মানবেন্দ্র বাবুর মতে, তারা দেশের মধ্যে সবচেয়ে ছোট জমিদার পরিবার। তারা ব্রাহ্মণ বংশীয় এবং তাঁদের পূর্বপুরুষেরা ভারতের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে এসেছিলেন। ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধে, পাকিস্তানি আগ্রাসী বাহিনী ও তাদের স্থানীয় সহযোগীরা তাঁর পিতা শ্রীভূপতিনাথ চক্রবর্তী চৌধুরীকে হত্যা করে এবং ৭ মে ১৯৭১ জমিদার বাড়িতে ব্যাপক ক্ষতি সাধন করে।

যে স্থানে তাঁর পিতা পাকিস্তানি সেনাবাহিনী দ্বারা নিহত হন, সেখানে একটি স্মৃতিসৌধ নির্মাণ করা হয়েছে। মুক্তিযোদ্ধা সংগঠন একটি প্রামাণ্যচিত্র নির্মাণ করেছে গাঙ্গাটিয়া জমিদার বাড়ির হত্যাকাণ্ড সম্পর্কে।

এ স্থাপনাটি নিয়মিত স্থানীয় বাসিন্দা, বিদেশী পর্যটক, শিক্ষক-শিক্ষার্থী, সাংবাদিক এবং অন্যান্য শ্রেণির মানুষজনের দ্বারা পরিদর্শিত হয়। যদি জমিদার বাড়িটি সংস্কার করা যায়, তবে এটি একটি প্রধান আকর্ষণও হতে পারে।

বর্তমানে তিনি এখানে একাকী বসবাস করছেন। তাঁর প্রয়াত ছোট ভাই তপন কুমার চক্রবর্তী চৌধুরী ও তাঁর কোনো সন্তান নেই।

এই জমিদার বাড়িটি প্রায় ১০ একর জমির উপর অবস্থিত। জমিদার বাড়ির মূল দরজাটি নকশায় ভরা।

এই জমিদার বাড়ির কারুকার্য ও নান্দনিক সৌন্দর্য এখনো ঐতিহ্যবাহী গৌরবের সাক্ষী হিসেবে জাঁকজমকপূর্ণভাবে দাঁড়িয়ে আছে। যা’ প্রতিদিন শত শত পর্যটকদের আকর্ষণ করে।

বর্তমানে মানবেন্দ্র নাথ চক্রবর্তী চৌধুরী (মানব বাবু) একাকী এই ঐতিহ্যবাহী বাড়িতে বসবাস করছেন। তিনি ইতিমধ্যেই এলাকার সেরা সমাজসেবক ও ঐতিহাসিক ব্যক্তিত্ব হিসেবে সুপরিচিত। যদিও তাঁর কোনও সন্তান নেই, তবুও তিনি বাড়িটি সংরক্ষণ ও সংস্কারের ব্যাপারে চিন্তিত। এই জমিদার বাড়ি সংস্কারক্রমে ও পর্যটন ক্ষেত্র হিসেবে গড়ে উঠলে তা’ স্থানীয় অর্থনীতি ও সংস্কৃতির জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ আকর্ষণ হতে পারে।

গাঙ্গাটিয়া জমিদার বাড়ি বাংলাদেশের ঐতিহাসিক ও স্থাপত্য ঐতিহ্যের এক অনন্য নিদর্শন। এর গৌরবময় অতীত, কারুকার্য, এবং সামাজিক প্রভাব আজো স্থানীয় জনজীবনে জ্বলজ্বল করছে। এই বাড়ির রক্ষণা-বেক্ষণ ও সঠিক পরিচর্যা বাংলাদেশের ঐতিহ্য সংরক্ষণের জন্য অপরিহার্য‌।

Please Share This Post in Your Social Media

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category

© All rights reserved © 2022

ডিজাইন ও কারিগরি সহযোগিতায়: সীমান্ত আইটি