মা ও মেয়ের এসএসসি পাসের ব্যবধান ৭ বছর! বাজিতপুরে স্বাস্থ্যকেন্দ্রের সেই জালিয়াতি ঢাকতে সাংবাদিককে মধ্যরাতে বিএনপি নেতার হুমকি
কিশোরগঞ্জ প্রতিনিধি
মা এসএসসি পাস করেছেন ২০০৪ সালে, আর মেয়ে পাস করেছেন ২০১১ সালে! মাত্র সাত বছরের ব্যবধানে মা ও মেয়ের এসএসসি পাসের এমন ‘অলৌকিক’ ও রহস্যজনক জালিয়াতির তথ্য চেপে বসতেই এবার মাঠে নেমেছেন এক রাজনৈতিক নেতা। কিশোরগঞ্জের বাজিতপুরে একটি ইউনিয়ন স্বাস্থ্য কেন্দ্রের এই পুকুরচুরি ও অবিশ্বাস্য জালিয়াতির অনুসন্ধান করায় এক প্রবীণ সাংবাদিককে মধ্যরাতে ফোন করে ওল্টো প্রাণনাশের হুমকি দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে স্থানীয় এক বিএনপি নেতার বিরুদ্ধে।
হুমকির শিকার সাংবাদিক খায়রুল ইসলাম ‘কালের নতুন সংবাদ’ পত্রিকার সম্পাদক এবং বাংলাদেশ মফস্বল সাংবাদিক ইউনিয়ন (বিএমইউজে) কিশোরগঞ্জ জেলা শাখার সভাপতি। আর অভিযুক্ত বোরহান নিজেকে বাজিতপুর উপজেলা বিএনপির সহসভাপতি হিসেবে পরিচয় দিয়ে বেড়ান। এই চাঞ্চল্যকর ঘটনা প্রকাশ্যে আসার পর কিশোরগঞ্জসহ দেশজুড়ে গণমাধ্যমকর্মীদের মাঝে তীব্র ক্ষোভ ও তোলপাড় সৃষ্টি হয়েছে।
ঘটনার সূত্রপাত বাজিতপুর উপজেলার বালিয়ারদি ইউনিয়ন স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ কেন্দ্র থেকে। সম্প্রতি সেখানে সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, সরকারি নিয়ম-নীতির তোয়াক্কা না করে নির্ধারিত সময়ে কোনো কর্মকর্তা-কর্মচারীই কেন্দ্রে উপস্থিত থাকেন না। স্থানীয়দের অভিযোগ, দিনের বেলা তালাবদ্ধ থাকা এই স্বাস্থ্য কেন্দ্রটি রাতে পরিণত হয় মাদকের আখড়ায়। অনুসন্ধানে জানা যায়, কেন্দ্রের উপসহকারী কমিউনিটি মেডিকেল অফিসার মহিতোষ বাবু সরকারি নিয়ম ভেঙে দিলালপুর এলাকার উম্মে হানি নামের এক কর্মীকে সরকারি কক্ষ ভাড়া দিয়েছেন এবং নিজে বাড়ি বসেই খেয়ালখুশিমতো কেন্দ্রটি চালাচ্ছেন। শুধু তাই নয়, হাসপাতালের সরকারি জমি দখল করে দোকান নির্মাণ ও তা ভাড়া দেওয়ার গুরুতর অভিযোগও রয়েছে তাঁর বিরুদ্ধে।
সেদিন সংবাদকর্মীদের উপস্থিতির খবর পেয়ে তড়িঘড়ি করে কেন্দ্রের তালা খুলতে আসেন এক পরিচ্ছন্নতাকর্মী । তিনি অকপটে স্বীকার করেন, সকাল ১০টার আগে সাধারণত কেউই এখানে আসেন না। কেন্দ্রের নিরাপত্তাকর্মীকে কর্মস্থলে পাওয়া না গেলেও তিনি নাকি ছুটিতে আছেন—তবে এমন কোনো ছুটির কাগজ দেখাতে পারেননি দায়িত্বরত মহিতোষ। এছাড়া প্রতি মাসে স্থানীয় প্রাথমিক বিদ্যালয়ে স্বাস্থ্যসেবা দেওয়ার সরকারি নিয়ম থাকলেও মহিতোষ তা কোনোদিন করেননি। অথচ মাসিক প্রতিবেদনে ওই স্কুলের নাম ব্যবহার করে মাসের পর মাস ভুয়া তথ্য জমা দিয়ে আসছিলেন তিনি।
সবচেয়ে বড় চমকটি বেরিয়ে আসে উম্মে হানি ও তাঁর মেয়ের নথিপত্র ঘেঁটে। দিলালপুর স্বাস্থ্য কেন্দ্রের মাঠকর্মী উম্মে হানির চাকরিতে যোগদান ২০০৮ সালে এবং তাঁর মেয়ে সিনসাইদি বালিয়ারদি স্বাস্থ্য কেন্দ্রের ভিজিটর পদে যোগদান করেন ২০২০ সালে। কিন্তু নথিপত্র অনুযায়ী, মা উম্মে হানি এসএসসি পাস করেছেন ২০০৪ সালে এবং মেয়ে পাস করেছেন ২০১১ সালে। মা-মেয়ের পড়াশোনা ও চাকরির এই অবিশ্বাস্য শুভঙ্করের ফাঁকি ও দুর্নীতির তথ্য ধামাচাপা দিতেই মূলত মরিয়া হয়ে উঠেছে একটি চক্র।
এইসব অনিয়ম ও জালিয়াতির অকাট্য তথ্য নিয়ে সাংবাদিক খায়রুল ইসলাম কিশোরগঞ্জ জেলা পরিবার পরিকল্পনা কার্যালয়ে যোগাযোগ করেন। জেলা উপপরিচালক খন্দকার মাহবুবুর রহমান জেলা কার্যালয়ের মাসিক সভায় বিষয়টি উপস্থাপন করার পর পরই ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠেন বিএনপি নেতা বোরহান। গত মঙ্গলবার (২৩ জুন) রাত ১১টা ১৬ মিনিটে তিনি সাংবাদিক খায়রুল ইসলামকে ফোন করে সরাসরি প্রাণনাশের হুমকি দেন। এ সময় বোরহান তাঁর ছেলে আইনজীবী এবং জেলা বিএনপির শীর্ষ নেতাদের প্রভাব খাটানোর ভয়ভীতি দেখান। স্থানীয় সূত্রের দাবি, কয়েক লাখ টাকার একটি বড় অঙ্কের অবৈধ রফাদফা আড়াল করতেই ওই নেতা সাংবাদিকের মুখ বন্ধ করার এই অপচেষ্টা চালাচ্ছেন। ইতিমধ্যেই হুমকির অডিও ও ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে।
এদিকে সাংবাদিককে হুমকির তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানিয়ে বাংলাদেশ মফস্বল সাংবাদিক ইউনিয়ন (বিএমইউজে) কিশোরগঞ্জ জেলা কমিটি এক বিবৃতিতে জানিয়েছে, সত্য প্রকাশ করায় কলম সৈনিকদের কণ্ঠরোধের এই অপচেষ্টা কোনোভাবেই বরদাশত করা হবে না। অবিলম্বে হুমকিদাতা বোরহানকে গ্রেপ্তার করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি এবং সাংবাদিক খায়রুল ইসলামের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জোর আহ্বান জানানো হয়েছে। অন্যথায় দেশব্যাপী কঠোর কর্মসূচি ঘোষণা করা হবে বলে হুঁশিয়ারি দিয়েছেন সাংবাদিক নেতারা।
এসব বিষয়ে দিলালপুর স্বাস্থ্য কেন্দ্রের মাঠকর্মী উম্মে হানি বলেন, আমি ২০০৪ এ এসএসসি পাস করেছি মাদ্রাসা থেকে। আমার মেয়ে এসএসসি পাস করেছে ২০১১ তে। এদিকে মা ও মেয়ের জাতীয় পরিচয় পত্রে দেখা গেছে মা উম্মে হানির জন্ম ১৯৮৯ সালের ৩ জানুয়ারি ও মেয়ে সিনসাইদী জন্ম ১৯৯৫ সালের ১৮ মার্চ।
অভিযোগের বিষয়ে বক্তব্য জানতে বোরহানের মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হলে অস্বীকার করে তিনি বলেন, আমি কাউকে প্রাণনাশের হুমকি দেয়নি।
তবে বাজিতপুর উপজেলা পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা মুজিবুর রহমান জানিয়েছেন, স্বাস্থ্য কেন্দ্রের অনিয়ম ও জালিয়াতির বিষয়ে তদন্ত শুরু হয়েছে এবং দ্রুতই কঠোর প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
© All rights reserved © 2022
Leave a Reply