সঞ্জিত চন্দ্র শীল
হোসেনপুর (কিশোরগঞ্জ) প্রতিনিধি:*
জাইকা প্রকল্পের অর্থায়নে ও রুপসা বিল সুলাদল সমবায় সমিতি লিমিটেডের বাস্তবায়নে হোসেনপুর উপজেলার পুমদী ইউনিয়নের টনিহারা খাল খননের ফলে এবার বোরো মৌসুমে কৃষকের ঘরে উঠেছে সোনালী ফসল। দীর্ঘদিনের জলাবদ্ধতা ও সেচ সংকট কাটিয়ে কৃষক এখন স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলছেন।
স্থানীয় মোঃ মেহেদী হাসান রুমান,রওশন মিয়া, নূর উদ্দিন আবুল কাশেম সহ অনেক কৃষকরা জানান, টনিহারা খালটি দীর্ঘদিন ধরে ভরাট হয়ে যাওয়ায় বর্ষা মৌসুমে জলাবদ্ধতা ও শুষ্ক মৌসুমে সেচের পানির অভাবে পুমদী ইউনিয়নের হাজার হাজার হেক্টর জমি অনাবাদি পড়ে থাকত। বিশেষ করে রুপসা বিল সংলগ্ন নিচু এলাকার জমিগুলোতে সময়মতো পানি নিষ্কাশন না হওয়ায় ধান রোপণ ও কর্তন দুটোই অনিশ্চিত হয়ে পড়ত।
এ অবস্থায় জাইকা অর্থায়িত “ক্ষুদ্রাকার পানি সম্পদ উন্নয়ন প্রকল্প” এর আওতায় রুপসা বিল সুলাদল সমবায় সমিতি লিমিটেডের মাধ্যমে প্রায় ৫ কিলোমিটার দীর্ঘ টনিহারা খালটি পুনঃখননের উদ্যোগ নেওয়া হয়। গত ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে খাল খননের কাজ সম্পূর্ণ হয়।
খাল খননের ফলে এবার বোরো মৌসুমে পুমদী ইউনিয়নের টনিহারা, পুমদী, জগদল, বর্শিকুড়া, চরপুমদী গ্রামের প্রায় ১,২০০ একর জমিতে নির্বিঘ্নে সেচ সুবিধা পেয়েছেন কৃষকরা। একই সাথে বর্ষা মৌসুমের আগেই পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থা সচল থাকায় আগাম বন্যার হাত থেকেও রক্ষা পেয়েছে ফসল।
টনিহারা গ্রামের কৃষক আব্দুল হামিদ বলেন, “গত ১০ বছর ধইরা এই বিলের জমিত ধান করতে পারি নাই। খাল ভরাট থাকায় পানি নামত না। এবার খাল কাটার পর জমিত পানি দেওন গেছে, আবার পাকার পর কাইট্টাও ঘরে তুলতে পারছি। জাইকা আর সমিতির লোকদের জন্য দোয়া করি।”
আরেক কৃষক জাহানারা বেগম জানান, “আগে পানি জমি থাকত, ধান পইচা যাইত। এবার খাল দিয়া সুন্দর পানি নামছে। আমার ৩ বিঘা জমিত ৯০ মণ ধান হইছে। পোলাপান নিয়া এখন শান্তিতে খাইতে পারমু।”
রুপসা বিল সুলাদল সমবায় সমিতি লিমিটেডের সভাপতি আঃ রউফ মেম্বার বলেন, জাইকার আর্থিক ও কারিগরি সহায়তায় আমরা অত্যন্ত স্বচ্ছতার সাথে খাল খননের কাজটি সম্পন্ন করেছি। কাজের সময় স্থানীয় কৃষকদের মতামত নেওয়া হয়েছে। খাল খননের ফলে শুধু বোরো নয়, আমন মৌসুমেও এর সুফল পাবেন কৃষকরা। আমাদের লক্ষ্য কৃষকের উৎপাদন বাড়ানো এবং তাদের জীবনমান উন্নয়ন করা।
হোসেনপুর উপজেলা কৃষি অফিসার কৃষিবিদ
শেখ মোহাম্মদ মহসিন বলেন, টনিহারা খাল খনন পুমদী ইউনিয়নের কৃষিতে বৈপ্লবিক পরিবর্তন এনেছে। আমরা মাঠ পর্যায়ে খোঁজ নিয়ে দেখেছি, এ বছর ওই এলাকায় বোরোর ফলন হেক্টর প্রতি প্রায় ৬.২ মেট্রিক টন হয়েছে, যা গত বছরের চেয়ে ১৮% বেশি। জলাবদ্ধতা দূর হওয়ায় পতিত জমি চাষের আওতায় এসেছে। এটি স্মার্ট কৃষি বিনির্মাণে একটি মাইলফলক।
এলাকাবাসী দুলাল, খাইরুল ইসলাম সহ অনেকেই জানান খালটি নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ এবং খালের দুই পাশে বাঁধ নির্মাণের দাবি জানিয়েছেন। যাতে ভবিষ্যতে খালটি আবার ভরাট হয়ে না যায় এবং বর্ষায় ভাঙন থেকে রক্ষা পায়।
খাল খননের ফলে শুধু ফসল উৎপাদনই বাড়েনি, এলাকার জীববৈচিত্র্য রক্ষা ও মৎস্য সম্পদ বৃদ্ধিতেও ভূমিকা রাখছে বলে মনে করছেন পরিবেশবিদরা।
© All rights reserved © 2022
Leave a Reply